সংবাদ কণ্ঠ - তসলিমা নাসরিন-এর ধারাবাহিক উপন্যাস শরম [প্রথম পর্ব]
জুয়েলারী জগতে আলোচনার কেদ্রবিন্দুতে “ডায়মন্ড সিটি” কেবিন ক্রূ/ ফ্লাইট স্টুয়ার্ড নেবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স (ছেলেমেয়ে উভয়ই) বিনা অভিজ্ঞতায় “কেবিন ক্রু” পদে লোক নিবে নভো এয়ারলাইন্স, যোগ্যতা HSC, আবেদন করতে পারবে ছেলে মেয়ে উভয়ই। অচেনা নায়ক ! Unseen Hero !! কেবিন ক্রু নিয়োগ দেবে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ,যোগ্যতা উচ্চ মাধ্যমিক ,আবেদন করতে পারবে ছেলে মেয়ে উভয়ই বিনা অভিজ্ঞতায় “কেবিন ক্রু” পদে চাকরি, যোগ্যতা HSC পাশ, বেতন ৮০০০০ টাকা ইউএস-বাংলার বহরে নতুন বোয়িং যুক্ত ‘চাকরির হতাশায়’ ঢাবি গ্রাজুয়েটের আত্মহত্যা ! নতুন ৫ টিভি চ্যানেলের অনুমোদন , মিডিয়াতে কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ জবস এওয়ানের এক যুগ পূর্তি
ঢাকা, জুন ১৪, ২০২১, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮, স্থানীয় সময়: ০৯:৩০:৪৫


তসলিমা নাসরিন-এর ধারাবাহিক উপন্যাস শরম [প্রথম পর্ব]

| ৩১ শ্রাবণ ১৪২১ | Friday, August 15, 2014

Photo

আমার সঙ্গে হঠাৎ সুরঞ্জনের দেখা। আমার রাউডন স্ট্রিটের বাড়িতে সে একদিন দরজায় বেল টিপল। খুলে দেখি অচেনা একটি ছেলে।

- কী চাই?

- আপনাকে চাই।

- আমাকে কেন?

-খুব দরকার।

-খুব দরকার বললে তো হবে না, আপনি কোত্থেকে এসেছেন, কেন এসেছেন বলুন।

ছেলেটি মাথা চুলকোলো নাকি হাত চুলকোলো আমার মনে নেই, তবে কিছু একটা চুলকেছিলো। খুব স্মার্ট কিছু বলে আমার মনে হয়নি।

-এভাবে এলে দেখা করা সম্ভব নয়। ফোনে অ্যাপোয়েন্টমেন্ট করে তবে আসুন।

এই বলে দরজা বন্ধ করে দিলাম। দরজার ওপাশে–আমি সুরঞ্জন, সুরঞ্জন দত্ত, দরজাটা খুলুন, একটু কথা বলতে চাই–হাওয়ায় হারাতে থাকা আবছা আওয়াজ। নামটা চেনা লাগলো, সুরঞ্জন দত্ত। বড় চেনা নাম। কিন্তু যুবকের মুখ তো চেনা নয়। নিশ্চিত হওয়ার জন্য কোথায় দেখেছি, দরজা সামান্য ফাঁক করি। না মোটেও চিনতে পারছি না। মনেই হচ্ছে না কোনওকালে একে আমি দেখেছি কোথাও।

মুখে অপ্রস্তুত হাসি, যুবক বললো–আমি সুরঞ্জন। আমাকে চিনতে পারছেন না! আমাকে নিয়ে তো আপনি একটি উপন্যাস লিখেছিলেন।

-উপন্যাস?

-হ্যাঁ উপন্যাস। লজ্জা নামের উপন্যাসটি লিখেছিলেন। মনে আছে?

গা কেঁপে উঠলো আমার। যে মানুষ মরে গেছে জানি, অনেক বছর পর যদি তাকেই দেখি আমার দিকে হেঁটে আসতে, বোধহয় এমনই বোধ হবে। পিছোতে পারবো না, এগোতেও পারাবো না। বোবা হয়ে বোকা হয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকবো। যেমন আছি। তেমনই ছিলাম দাঁড়িয়ে, সুরঞ্জনের দিকে অপলক তাকিয়ে। সুরঞ্জন একবার আমাকে দেখছিল, আবার চোখ নামিয়ে গাল চুলকোচ্ছিল। হ্যাঁ তখন গালই চুলকোচ্ছিল। আমার মনে আছে, কারণ গালে ওর বড় একটি তিল আছে, উঁচু হয়ে থাকা তিলটিতে যখন ওর নখের অাঁচড় লাগছিল, মনে হচ্ছিল বুঝি তিলটি উঠে চলে আসবে। আমার ওই গা কাঁপা বোধটি চলে গেছে ওই তিলের কথা ভেবে। তিল নিয়ে আমার ভয় কয়েক বছরের। আমার এক ফরাসি বন্ধুর তিল দেখেছি, হাতের একটি ছোট্ট নিরীহ তিল কী করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ক্যানসার হয়ে গেল! যখন অল্প বয়স, মুখে ছোট হলেও কটি যেন তেন তিলের জন্য কত হা হুতাশ করেছি। ভুরু–পেন্সিল দিয়ে একটি তিল ঠোঁটের ওপর কত দিন এঁকেছি। আর এখন, কোথাও তিল গজাচ্ছে দেখলে আতঙ্ক হয়। সুরঞ্জনের তিলটি আমাকে ওই ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থা থেকে সরায়, নড়ায়। আমি দরজা পুরো খুলে ছেলেকে আহ্বান করি ভেতরে ঢোকার। দরজার সামনে যে দুজন পোশাক পরা পুলিশ রাইফেল হাতে বসে আছে, তারা ঝিমোচ্ছিল না, কিন্তু যাকে ঘরে ঢোকাচ্ছি, পকেটে তার বোমা আছে কি না, কোনও বদ উদ্দেশ্য আছে কি না আমার সঙ্গে দেখা করার, কিছু পরীক্ষা করলো না। পুলিশ আসলে আমার ঘরের সামনে ঠিক কী কারণে বসে থাকে আমি জানি না। এত লোক আসে যায়, কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করে না। আমি না হয় আজ দরজা খুলেছি, কিন্তু অন্যদিন দরজা খোলে সুজাতা। সুজাতাকে যদিও বলা আছে অচেনা কাউকে যেন দরজা না খোলে, কিন্তু গ্রামের খোলা বাড়িতে বড় হওয়া মেয়ে সে কথা সব সময় মনে রাখতে পারে না। আমার ইন্টারকমটা বছর দুয়েক অকেজো হয়ে পড়ে আছে। অভিযোগ অনেক করেছি, কিন্তু বাড়ির মেইনটেইন্স কমিটির কিছু যায় আসে না তাতে। এমন অনেকদিন হয়েছে যে, অচেনা লোক এসে ঢুকে গেছে বাড়িতে, পুলিশ যথারীতি দরজার সামনে রাইফেল পাশে রেখে ঝিমোচ্ছে। পুলিশ দেখে সুরঞ্জনের একটু ভয় হয় কী! মনে হয় হয়। কেমন যেন ফ্যাকাসে ভাব মুখে। আমি যখন তাকে ভেতরে ঢুকতে বলি, বসে থাকা পুলিশ আর দাঁড়িয়ে থাকা আমার মাঝখানের পথ দিয়ে তাকে এগোতে হবে, একটু দ্বিধান্বিত প্রথম। সে কারণে তিলের ওপর অাঁচড় দুচারাটে বেশি পড়ে। প্রথম পদক্ষেপে যে গতি ছিল, সেই গতি স্লথ হয় দ্বিতীয় পদক্ষেপে। তৃতীয়তে গিয়ে আরও স্লথ। চতুর্থতে গিয়ে, যখন দরজার ওপর তার শরীর, দ্রুত। সুরঞ্জন ঢুকে গেল। দরজা বন্ধ হল। সোফায় বসল সে। আমি উল্টোদিকে সোফায়।

সুজাতাকে চা বলে আমি যখন বসলাম তার মুখোমুখি, চোখ নামিয়ে নিল সে। মন এক অদ্ভুত জিনিস, আমার তখন মনে হতে লাগলো, কে বলেছে সে সুরঞ্জন! যদি অন্য লোক কোনও অভিসন্ধি নিয়ে সুরঞ্জন নামে এসে থাকে। তবে!

তারপর বলো বা বলুন কী খবর! এরকম কিছু বলার আগে আমি, চকিতে উঠে দরজা খুলে দিলাম, হাট করে নয়, আধখোলা। সুরঞ্জন বলে নিজেকে যে দাবি করছে, যদি তার উদ্দেশ্য মন্দ হয়, তবে সে বুঝবে দরজার ওপারে পুলিশ, সে কোনো আতঙ্কের চিৎকারে তারা ঘরে ঢুকে যেতে পারে, উদ্ধার করতে পারে আমাকে যে কোনও আততায়ী থেকে, এবং সন্ত্রাসী বা দুষ্কৃতির পরিণাম যে কী ভয়াবহ হবে, তা আমি অনুমান করার জন্য কিছুটা সময় তাকে দিই। সুরঞ্জন সময় নেয়। সময় নেওয়ার সময় মাথা তার নিচের দিকে ঝুলে থাকে। চুলে কিছুটা পাক ধরেছে। বয়স কত হবে তার! হিসেব করে দেখি আমার চেয়ে কম, কিন্তু খুব কম নয়। চুল তো আমারও পেকেছে। বয়স, এই একটা জিনিসই বোধহয় চোখের পলকে জীবন থেকে চলে যায়। জীবন থেকে অন্য কিছু এভাবে যায় না, বয়স যেভাবে যায়। আমার যে কী করে গেল! হঠাৎ একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখি অনেকগুলো চুল পাকা। নিজেকে চিনতে পারিনি। এ আমি তো! নিজেকে তো সেই সেদিনও কিশোরী বলেই জানতাম। সুরঞ্জন মাথা তুলে প্রশ্নের উত্তর দেয়, –কী আর খবর!

যখন চোখাচোখি হয়, মনে হয়, চোখ দুটো চেনা। তার সঙ্গে কি আমার কখনও দেখা হয়েছিল! সুরঞ্জনের খবর নেই, খবর আর এ সংসারে কী থাকতে পারে, বরং আমি যদি আমার খবরই ওকে জানাই, তার একটা অর্থ হয়, এরকম বলতে থাকে সে। আর আমি ভাবতে থাকি কোথায় কবে সুরঞ্জনের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল।

-আচ্ছা তোমার সঙ্গে কি আমার কখনও…

-না, কোনওদিনই দেখা হয়নি।

-হতে পারে? দেখা নিশ্চয়ই হয়েছে। দেখা না হলে কী করে উপন্যাস লিখলাম।

-শুনে লিখেছেন। কাজল দেবনাথ তো আমার বন্ধু, আপনারও চেনা ছিল। ওর কাছেই শুনেছেন আমার গল্প।

-তাঁতিবাজারে তোমাদের বাড়িতে তো আমি গিয়েছিলাম। তোমার সঙ্গে দেখা হয়নি?

-না। আমার সঙ্গে হয়নি। মার সঙ্গে হয়েছিল। আমি বাড়িতে পেঁৗছেছিলাম আপনি চলে যাওয়ার ঠিক সাত মিনিট পর।

সাত মিনিট শুনে হেসে উঠলাম আমি।

-এত মনে আছে?

সুরঞ্জন হেসে মাথা নাড়লো। বললো, -মনে না থেকে উপায় আছে?

তার চোখে যতবারই চোখ পড়ছে, মনে হচ্ছে এই চোখের সঙ্গে দেখা আমার আগে হয়েছেই। কোথায় হয়েছে কখন কিছু মনে নেই। কিন্তু সুরঞ্জন নিজে অস্বীকার করছে দেখা নাকি হয়নি। যে ছেলের সাত মিনিটের কথা মনে থাকতে পারে, দেখা হওয়ার কথা মনে থাকলে তারই থাকবে।

খবর দেওয়া নিয়ে সুরঞ্জনের খুব উৎসাহ আছে বলে আমার মনে হয় না।

সুজাতা চা দিয়ে গেল। সঙ্গে এক ব্যাগ মজার টোস্ট বিস্কুট। চায়ের সঙ্গে বিস্কুট দেওয়ার রীতি আমাদের খুব পুরোনো। বিস্কুট দেওয়া হলেও দেখেছি লোকে বিস্কুট নেয় না। চা-টাই খায়। সুরঞ্জন একটা বিস্কুট নিয়ে চায়ে ভিজিয়ে কামড় দিল। এই টোস্ট বিস্কুটগুলো আমাকে দেশের কথা মনে করিয়ে দেয়। বাবা রাতে ফেরার সময় প্রতিদিন কিছু না কিছু আনতেন। সেই কিছু না কিছুতে বিস্কুট থাকতোই। ছোটবেলায় কোনওদিনই বিস্কুটহীন রাতের বাবাকে দেখিনি। বাদামি কাগজের প্যাকেটে টোস্ট বিস্কুট থাকতোই। ওই বিস্কুট খেতে খেতে এত বীতশ্রদ্ধ ছিলাম যে টোস্ট হাতে নিয়ে ফিরলে মন খারাপ হয়ে যেত, বাবার ওপরও রাগ হত খুব। চাইতাম অন্য বিস্কুট। মিষ্টি বিস্কুট। ক্রিম লাগানো। টোস্ট ছাড়া অন্য কিছু। আর এখন সেই জীবন থেকে যোজন দূরের জীবনে এসে নানারকম সুস্বাদু সব বিস্কুটের মধ্য থেকে এক কিনারে অবহেলায় পড়ে থাকা টোস্ট বিস্কুটকে বড় ভালোবেসে তুলে নিই। এর ঠিক কী নাম, এই তুলে নেওয়ার, জানি না।

সুরঞ্জনকে সচেতনভাবেই আমি তুমি সম্বোধন করছি। আমার মনে হয়, যখন দেখা হয়েছিল ওর সঙ্গে ওকে আমি তুমি বলেই ডেকেছিলাম। মাথা থেকে আমার এক বছরে অনেক কিছু উবে গেছে। সুরঞ্জন নামের একটি ছেলের সঙ্গে দেখা হওয়ার যাবতীয়ও উবে গেছে। দেখাটা কবে কোথায় তার সামান্য তথ্যও নেই মাথার কোনও আনাচ কানাচে।

-সেই তিরানব্বইয়ে এদেশে এসেছো। অনেক বছর!

শুনে সুরঞ্জন মাথা নাড়ে,-হ্যাঁ অনেক বছর।

-আমার যদি তেরো বছর নির্বাসন। তোমাদের চৌদ্দ বছর।

Photo

এটুকু বলে বুঝতে পারি, সামান্য ভুল রয়ে গেল বলায়। তৎক্ষণাৎ শুধরে দিই, -অবশ্য নির্বাসনটা আমার, তোমাদের নয়।

সুরঞ্জন হাসলো। এই হাসিটি এমন যার কোনও ব্যাখ্যা করা যায় না।

আমার খুব জানার ইচ্ছে হয় কী করে যাপন করে সে তার জীবন। খুব ভালো একটি সৎ নিষ্ঠ আদর্শবাদী ছেলে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, সে জানি। কষ্ট ছাড়া করুণা ছাড়া তার জন্য আমার আর কিছু হয় না। তালিবানদের জন্য যেমন হয়। তালিবানদের সঙ্গে সুরঞ্জনের পার্থক্য হল, ওদের সামনে আর কোনও সম্ভাবনা দেওয়া হয়নি, এক মৌলবাদ ছাড়া। সুরঞ্জন সাম্প্রদায়িক হয়েছিল বটে, সামনে তার অন্য কিছু হওয়ার, বিপরীত কিছু হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। আসলে সুরঞ্জনকে দেখার পর আগে সেই আদর্শবাদী যুবক বলেই ওকে মনে হচ্ছিল। ও যে বদলে গিয়েছিল, ও যে খুব ছোট মনের ছেলে হয়ে উঠেছিল, মনে পড়েনি। মনে পড়ে মায়া হয়। ভেতরের মায়া আমাকে মায়ার কথা মনে করিয়ে দেয়। মায়া তো নেই। মায়াকে তো মেরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল লেকের জলে। সুরঞ্জনের নিশ্চয়ই খুব কষ্ট হয়, কষ্ট তো তার মার আরও নিশ্চয়ই হয়। কিরণময়ীর। সুধাময় দত্ত, সুরঞ্জনের বাবা কি বেঁচে আছেন, জিজ্ঞেস করতে চেয়েও করিনি। আমি বরং জানতে চাই সে থাকে কোথায়।

খুব ক্ষীণ কণ্ঠের উত্তর, -পার্ক সার্কাস।

-কাছেই তো।

-হ্যাঁ কাছেই।

-বাড়িতে কে কে আছে?

এই প্রশ্নটির উত্তরই জানতে চাই। সুধাময় বেঁচে আছেন কিনা, তা সরাসরি না জিজ্ঞেস করে এভাবেই জানতে চাইলাম। আমি নিজের জীবনে দেখেছি কেউ যখন আমাকে জিজ্ঞেস করে, তোমার বাবা বেঁচে আছেন তো? ভীষণ অপ্রস্তুত বোধ করি আমি। বেশির ভাগ সময় আমি কোনও উত্তর না দিয়ে, যেন শুনতে পাইনি প্রশ্নটি, অন্য কথায় চলে যাই। আর উত্তর যদি দিতেই হয়, হ্যাঁ জাতীয় কিছু বলে প্রসঙ্গান্তর করি।

সুরঞ্জন বললো, -মা আর আমি।

-মা আর তুমি? আমি পুনরুচ্চারণ করলাম। জেনেই করলাম যে করলাম। আসলে আমি ওর উত্তরটি আবার বলে বুঝতে চাইলাম যে ওর বাবা নেই। আর ও বিয়ে করেনি। বিয়ে করলে বউ থাকতো। এমনও হতে পারে, বিয়ে করেছিল। ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে।

-মা কেমন আছেন তোমার?

এই প্রশ্নটিই সম্ভবত সবথেকে ভালো প্রশ্ন, ওই প্রশ্নগুলোর চেয়ে, তোমার বাবা কি নেই? কী করে মারা গেলেন? বাবার না থাকায় তোমাদের নিশ্চয়ই খুব অসুবিধে হচ্ছে? টাকা কড়ি…? যে প্রশ্নগুলো করার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও করিনি, সেগুলো নিয়ে ভাবতে গেলেই দেখি টাকাকড়ির প্রশ্ন আসে। এই প্রশ্নটিকে তখন আমি আর আটকে রাখি না, ফোকড় থেকে চড়ুই পাখির মতো সুরুৎ করে বেরিয়ে আসে।

-কী কর তুমি? মানে চাকরি বাকরি? বা ব্যবসা বা কিছু? বলছিলাম জীবিকার জন্য কী করছো?

সুরঞ্জন ধীরে ধীরে হাত কচলাতে কচলাতে বলে, আপাতত কিছুই করছি না।

এই কিছুই না করার সংবাদটি দুঃসংবাদ নিঃসন্দেহে। কিছুই না করে সংসার কী করে চলছে ওর, তা আমি অনুমান করতে পারি না। লক্ষ করি, আমি খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবে সুরঞ্জনের সঙ্গে কথা বলতে পারছি না, পারছি না সম্ভবত এই কারণে যে তার ওই নষ্ট হয়ে যাওয়াটি আমি কিছুতেই মানতে পারিনি। সে যদি ও দেশ থেকে নিরাপত্তার অভাব বলে চলে আসতো, কোনও অসুবিধে ছিল না। কিন্তু যে ঘৃণা ছুড়তে ছুড়তে ও চলে এসেছে, তা আমার গা কাঁপিয়ে দেয়। ঘৃণা মৌলবাদী এমন কী সরকারের বিরুদ্ধে হতেই পারে, ঘৃণার পক্ষে সব রকম যুক্তি আছে। কিন্তু ঘৃণা যদি সাধারণ মানুষের জন্য হয়, যে কোনও মানুষের জন্য, তারা মুসলমান বলেই হয়, তাহলে যথেষ্ট আপত্তি আমার। আমি তা কোনওদিনই মানবো না। হিন্দু হয়েও যেমন মানুষ উদার এবং সৎ হতে পারে, একই রকম মুসলমান হয়েও পারে।

-আপনি এখানে অনেকদিন আছেন?

এবার সুরঞ্জন প্রশ্ন করলো। ওর প্রশ্নে আমি একরকম বাঁচলাম। অতিথি আপ্যায়ন করা মনে যদি প্রশ্ন করে করে কথা চালিয়ে যাওয়া হয়ে থাকে, তবে ওই অস্বস্তিকর আপ্যায়নের চাপ থেকে আমার অতিথিই আমাকে বাঁচালো।

সোফায় হেলান দিয়ে কুশন একটিকে কোলের ওপর নিয়ে বললাম, -হ্যাঁ, অনেকদিনই তো। প্রায় আড়াইবছর।

-ভিসা নিয়ে একটা সমস্যা হচ্ছিল। ওটা মিটেছে?

-এখন রেসিডেন্ট পারমিট পাচ্ছি। ছ মাস করে করে পারনিশান দিচ্ছে।

-সিটিজেনশিপের কিছু হয়নি? সুরঞ্জন জিজ্ঞেস করে।

-নাহ।

এই নাহ বলার সময়, যাকেই নাহ বলেছি, আমি খেয়াল করেছি, আমার একটি দীর্ঘশ্বাস বেরোয়।

কথা না পেলে যা হয়, বললাম,-তুমি খুব খবর রাখো দেখি।

-খবরের কাগজে পড়ি। তাই জানতে পারি।

-হঠাৎ আমার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে কেন হল তোমার!

প্রশ্ন করবো না এরকম পণ করার পরও প্রশ্নটি করে ফেলি কৌতূহলে।

-দেখা কয়েকবছর থেকেই করবো বলে ভেবেছি। তখন মাঝে মাঝে আপনি আসতেন কলকাতায়, বিদেশ থেকে। তাজ বেঙ্গলে আছেন, সেটাও শুনেছি। দেখা করতে খুব একটা সত্যি বলতে কি, সাহস হয়নি বলবো না, সংকোচ ছিল।

-সংকোচ কেন?

সুরঞ্জন এর কোনও জবাব না দিয়ে বললো,-এখন তো কিছুদিন এখানে আছেন!

ধীরে ধীরে বলি, -হ্যাঁ তা আছি। এখানেই তো থাকি। অনুমতি যতদিন জোটে, ততদিন আছি।

-বাইরে তো যাওয়া হয়?

-হ্যাঁ, নানা অনুষ্ঠানে ইওরোপে আমেরিকায় যাই। কিন্তু ফিরে আসি

কলকাতায়।

নিজের কথা বলার ইচ্ছে আমার নেই। ইচ্ছে, সুরঞ্জনের কথা শোনার। পার্ক সার্কাস এলাকায় সে থাকে। এলাকাটি যতদূর জানি মুসলমান অধ্যুষিত এলাকা। এই এলাকায় সুরঞ্জন বাস করছে, যে ছেলেটি প্রচণ্ড রকম হিন্দু! মেলাতে পারি না।

-একদিন আসুন আমাদের বাড়িতে। মা আপনার কথা মাঝে মাঝেই বলে। আপনার জন্য দুঃখ করেন খুব।

-দুঃখ? কেন?

-বলেন আমাদের কথা লিখতে গিয়েই আপনার এমন হয়েছে। দেশ থেকে বিতাড়িত।

আমি আরও দুকাপ চায়ের কথা সুজাতাকে বলে তার পর বলি,-

-লজ্জা লেখার কারণে আমার নির্বাসন হয়নি। লজ্জা তো সরকার নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। আমার বিরুদ্ধে ধর্মান্ধরা ক্ষেপে আগুন হয়ে গিয়েছিল কারণ

আমি ইসলাম ধর্মের সমালোচনা করেছি। নারীর স্বাধীনতার পথে সব ধর্মই বাধা। আমার এই কথাটি ধর্মান্ধরা বা ধার্মিকেরা মেনে নিতে পারেনি।

আমি ইচ্ছে করেই ধর্ম প্রসঙ্গে বললাম। কারণ সুরঞ্জন যেহেতু ধর্মান্ধে পরিণত হয়েছে, ধর্ম সম্পর্কে আমার আগের সেই মতও যে এখনও অটুট আছে, তা সে জানুক। রাজনৈতিক দুরবস্থার শিকার হলে আমি যে আমার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হই না, তা বুঝুক।

বারান্দায় রোদ এসে পড়েছে। মিনু, আমার বেড়াল, আমার পালক মেয়ে রকিং চেয়ারটায় চিৎ হয়ে শুয়ে ঘুমোচ্ছে। টবের গাছগুলো বেশ লাগছে বারান্দায়। বারান্দার কাচের দরজাটা আমি খোলাই রাখি। তাতে ঘরটা বেশ বড়, যেন দিগন্ত ছুঁয়েছে এমন মনে হয়। বারান্দায় দাঁড়ালে যদি একটা সমুদ্র দেখা যেত, নয়ত একটা একলা পাহাড়! অবশ্য জীবনে অনেক পাগল করা প্রকৃতি আমি দেখেছি। পৃথিবীর সমস্ত সুন্দরের সামনে দাঁড়িয়ে থেকেছি। শুধু প্রকৃতি দিয়ে কি মন ভরে। মানুষ চাই, মানুষ।

সুরঞ্জনকে কি সেই মানুষের কাতারে ফেলবো আমি! আবার একদিন কি ওর সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে আমার হবে!

সুরঞ্জনের দিকে তাকিয়ে আমার রাগ হওয়ার বদলে সত্যিই মায়া হয়। কী ভীষণ ঝড় বয়ে গিয়েছিল ওর জীবনে। কিছুই কি আর লিখতে পেরেছি!

-আসলে কি জানো, লজ্জায় খুব বেশি তোমাদের কথা লিখতে পারিনি। তথ্যই বেশি দিয়েছিলাম। তথ্যমূলক বই করারই ইচ্ছে ছিল বলে।

সুরঞ্জন আবারও সেই হাসিটি হাসে।

হঠাৎ মনে পড়ে বলে বলি ওকে,-বিদেশে তো কত লোক অ্যাসাইলাম পেয়ে গেল লজ্জায় তাদের নাম আছে বলে, কত মুসলমান নাম পাল্টে হিন্দু নাম রাখলো, যেন অ্যাসাইলাম পেতে সুবিধে হয়। সুরঞ্জন দত্ত নাম দিয়েও অনেকে আমার বিশ্বাস অ্যাসাইলাম পেয়েছে। তুমিও পেতে অ্যাসাইলাম। অবশ্য তুমি তো বোধহয় ভারতেই আসতে চেয়েছিলে…

তার চোখ আমার চোখে সম্ভবত বোঝে সে, আমি বলতে চাইছি, দেশ ছড়ার পর অন্য কোনও দেশ নয়, ভারতকেই আশ্রয় ভেবেছিল সুরঞ্জন নিজে হিন্দু বলে, হিন্দুর দেশ ভারত এই ধারণা তো সব কট্টরপন্থীর। আর কট্টরপন্থী হতে সুরঞ্জনের বাকিই বা কী ছিল!

-মাকে একদিন নিয়ে আসবো এখানে।

বললো সে। ওর মলিন সার্টটির দিকে, ওর মলিন জিনসটির দিকে, খুলে রাখা ওর মলিন জুতোর দিকে, মোবাইল বাজতে যেটি সে সার্টের পকেট থেকে ধরে তাড়াতাড়ি বন্ধ করে দিল সেই মলিন মোবাইলের দিকে তাকিয়ে আমি বুঝি সুরঞ্জনের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। ও কোনও অর্থ সাহায্যের জন্য কি আমার কাছে এল! বা কোনও চাকরি চাইতে। যদিও আমার কোনও ক্ষমতা নেই, তারপরও লোক আমার কাছে আবদার করে। এখানকার অনেকের ধারণা আমার সাংঘাতিক ক্ষমতা। আমার অঢেল টাকা, যে টাকা কোনওদিন ফুরোবে না, এমন ভাবার লোকও কম নেই।

পরের কাপে চুমুক দিয়ে সুরঞ্জন আমার ঘরটি দেখে। খুব মন দিয়ে দেয়ালের ছবিগুলো দেখে। বইয়ের আলমারিগুলো, ফ্রিজের গায়ে সাঁটা বিঅ্যাওয়ার অব ডগমা স্টিকারটির দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। ঘরটি খুব দেশি জিনিসে সাজানো। এতকাল বিদেশ থাকার কোনও চিহ্ন নেই ঘরে, তা কি ও টের পায়!

-মাকে একদিন নিয়ে আসবো?

-হ্যাঁ নিশ্চয়ই নিয়ে এসো।

সুরঞ্জন অনেকক্ষণ খালি হয়ে যাওয়া চায়ের কাপটি ট্রেতে রেখে হঠাৎ বলে, -আমাকে যেতে হবে। বলেই সে উঠে দরজার দিকে হাঁটতে থাকে। দরজা খোলায় সাহায্য করতে করতে আমি বলি-খুব তাড়া আছে বুঝি?

সুরঞ্জন হ্যাঁ এবং না দুরকম মাথাই নাড়ে।

-তুমি আমার ফোন নম্বরটা রাখতে পারো, তোমার মাকে নিয়ে আসার আগে ফোন করে এসো।

দরজায় দাঁড়িয়ে সুরঞ্জনকে আমার নম্বর দিই। অন্যদের বেলায় এভাবে দরজায় দাঁড়াই না। জানি না সুরঞ্জনের জন্য কেন আমার মায়া হচ্ছে! সে আমার উপন্যাসের নায়ক ছিল বলে, নাকি ওর দারিদ্র্যের কারণে আমার একটু মায়া হচ্ছে বলে? লিফটে ওঠার আগে সুরঞ্জন বললো, -মায়াও খুব আসতে চাইবে। ওকেও কি…?

-মায়া?

আমার চোখ বিস্ফারিত সে আমি বুঝি।

-হ্যাঁ মায়া।

-মায়া?

-হ্যাঁ মায়া।

-ও।

যেন আমি দীর্ঘকালের একটি কষ্টের পাথর নিজ থেকে দেখলাম বুক থেকে সরে গেল।

লিফট নেমে গেল। ড্রইংরুমের যে চেয়ারে সুরঞ্জন বসেছিল, সেই চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আমি চোখ বুঝে পড়ে রইলাম। [চলবে]

দ্বিতীয় পর্বের লিংক : ▬>>sangbadkantha.com/181

[ ঘোষণা : নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন-এর উপন্যাস শরমধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হবে প্রতি শুক্রবারবাংলাদেশ প্রতিদিন‘-এর সৌজন্যে তা তুলে ধরা হবে সংবাদ কন্ঠ -এর পাঠকদের জন্য